শিরোনাম
◈ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ◈ বিশ্বকা‌পের প্রস্তু‌তি ম‌্যা‌চে ‌রোববার সকা‌লে মিশরের মুখোমুখি ব্রাজিল ◈ অপরাধী শনাক্তে ঢাকায় এআই প্রযুক্তি: ২ লাখ অপরাধীর তথ্য যুক্ত হচ্ছে, মুখমণ্ডল শনাক্ত করে পাঠাবে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা ◈ এবা‌রের বিশ্বকা‌পে আ‌র্জেন্টিনা ক‌তোটা শ‌ক্তিশালী, রোববার সকা‌লে পরীক্ষা নে‌বে হন্ডুরাস ◈ দেশের শিশুস্বাস্থ্যে গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, তবু শয্যা ও প্রযুক্তি সংকট ◈ কাল শুরু হচ্ছে সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন, বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ◈ 'অনেক কষ্টে এসএসসি পাস করেছে' কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসককে নিয়ে আসিফের কড়া মন্তব্য; দিলেন বরাদ্দের ব্যাখ্যা ◈ তুরস্ক কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে? ◈ ট্রাম্পের জন্য ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’: জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত চায় ইরান ◈ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠক

প্রকাশিত : ২৭ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:২১ বিকাল
আপডেট : ০৩ জুন, ২০২৬, ১২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তেল ছাপিয়ে বিরল খনিজ সম্পদের নতুন বিশ্বশক্তি হওয়ার পথে সৌদি আরব

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বুধবার ঘোষণা দিয়েছেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে সম্ভাব্য একটি চুক্তির বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে গ্রিনল্যান্ডের বিরল খনিজের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অধিকার থাকবে। ট্রাম্পের এ ঘোষণার পর বিরল খনিজের বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।

বিরল খনিজ উপাদানগুলো পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এবং আধুনিক সামরিক যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিতে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এগুলোর প্রধান নিয়ন্ত্রক মূলত চীন।

ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্য বলছে, বিশ্বের প্রায় ৯০ শতাংশ পরিশোধিত বিরল খনিজ এবং ৬০ শতাংশ বিরল খনিজসমৃদ্ধ খনির উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে চীন।

গত সপ্তাহে সৌদি আরবের রিয়াদে ফিউচার মিনারেলস ফোরামে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন মার্কিন জ্বালানি সংস্থা সেফের মিনারেলস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক আবিগেইল হান্টার। তার ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে অনেক এগিয়ে আছে চীন।

হান্টার বলেন, ‘চীন দশকের পর দশক ধরে কৌশলগত বিনিয়োগ, রাষ্ট্রসমর্থিত প্রকল্প ও বেসরকারি খাতের সঙ্গে সমন্বয়ের মধ্য দিয়ে এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিনিয়োগ করে এগিয়ে গেছে।’

সৌদি আরব দাবি করছে, তাদের কাছে ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের খনিজ সম্পদ আছে। এর মধ্যে রয়েছে সোনা, জিঙ্ক, তামা ও লিথিয়াম। পাশাপাশি ডিসপ্রোসিয়াম, টার্বিয়াম, নিওডিমিয়াম এবং প্রাসিওডিমিয়ামের মতো বিরল খনিজও রয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে নানা প্রযুক্তিতে বিরল খনিজ ব্যবহৃত হয়।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে সৌদি আরবের খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানের বাজেট ৫৯৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও খনিসমৃদ্ধ দেশ কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ার তুলনায় এ বাজেট এখনো কম। সৌদি আরবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে নতুন খনি স্থাপনের লাইসেন্স দেওয়ার কাজও দ্রুত এগোচ্ছে।

খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান এক বিষয়, আর এর চূড়ান্ত ফলাফল পাওয়াটা আরেক বিষয়। হান্টার বলেছেন, ‘বাস্তবতা হলো খনি খনন একটি দীর্ঘমেয়াদি কাজ। প্রক্রিয়াকরণ একটি কেন্দ্র তৈরি করতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছর সময় লাগে। কিছু কিছু এলাকায় ২৯ বছর পর্যন্তও সময় লাগতে পারে।

সৌদি আরব এখন খনিজ খাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাচ্ছে, এ খাতে বিনিয়োগের কর কমাচ্ছে এবং খনি খাতে প্রতিষ্ঠিত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিতে বড় আকারে ব্যয় করার পরিকল্পনা করছে।

ফিউচার মিনারেলস ফোরামে সৌদি আরবের সরকারি খনি কোম্পানি মাদেন ঘোষণা দিয়েছে, আগামী দশকে ধাতু ও খনিজ খাতে ১১ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে তারা। এর মধ্যে রয়েছে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব তৈরি করা এবং শিল্প খাতে দক্ষ কর্মীদের আকর্ষণ করা।

মিনারেলস ফোরামে দেওয়া বক্তব্যে মাদেনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বব উইল্ট বলেন, ‘আমরা যে একা একা এ কাজটা করতে পারব না, সেটুকু বোঝার ক্ষমতা আমাদের আছে।’

সৌদি আরবের খনিজ সম্পদের মূল্য এখনো দেশটির তেলসম্পদের মূল্যের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু দেশটি খনিজ খাতে বিনিয়োগ করছে অন্য কিছু কারণে।

অর্থনীতিকে বৈচিত্র্যময় করতে ভিশন ২০৩০ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল সৌদি আরব সরকার। তারা খনিজ খাতকে একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সৌদি আরব এখন আর শুধু খনিজ সম্পদ আহরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছে না; বরং অভ্যন্তরীণ শিল্প খাতের জন্য এর সরবরাহ শৃঙ্খলব্যবস্থাকে উন্নত করতে চাইছে। দেশটি বৈদ্যুতিক যানবাহন নির্মাণের উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সৌদি আরবের অবকাঠামো দ্রুত সমৃদ্ধ হলে দেশটি অন্যান্য দেশের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পরিশোধনের একটি আঞ্চলিক কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

হান্টার মনে করেন, গ্লোবাল সাউথের (এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের স্বল্পোন্নত দেশ) দিকে নজর দিলে এবং আফ্রিকার দেশগুলোর সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তুললে, পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার দিক থেকে সৌদি আরবে আরও বেশি করে খনিজ সম্পদ প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব।

সৌদি আরবের এমন পরিকল্পনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রও আগ্রহী। কারণ যুক্তরাষ্ট্র আগে নিজ দেশের বিরল খনিজ আহরণের পর সেগুলো পরিশোধনের জন্য চীনে পাঠাত। কিন্তু গত বছর চীন বিরল খনিজ রপ্তানিতে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। এসব খনিজ সম্পদের অনেকগুলো সামরিক কাজে ব্যবহৃত হয়।

গত বছরের নভেম্বর মাসে সৌদি আরব ঘোষণা দিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও শিল্প খাতে এক লাখ কোটি ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করবে। এ চুক্তির আওতায় খনিজ সম্পদ খাতে দুই দেশ একে অপরকে সহযোগিতা করবে।

যুক্তরাষ্ট্রের এমপি ম্যাটেরিয়ালস (যেটি পেন্টাগনের সহায়তাপ্রাপ্ত) কোম্পানি বলেছে, তারা মাদেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে সৌদি আরবে একটি নতুন খনিজ পরিশোধনাগার নির্মাণ করবে। এই পরিশোধনাগারের ৪৯ শতাংশ মালিকানা থাকবে এমপি ম্যাটেরিয়ালস ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের হাতে।

ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি মেলিসা স্যান্ডারসন বলেন, খনিজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করে তোলার ক্ষেত্রে সৌদি আরবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দেশটিতে থাকা নির্ভরযোগ্য পরিমাণের জ্বালানি। তা ছাড়া এ কাজে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন জ্বালানি কোম্পানি আরামকোরও দক্ষতা রয়েছে। তারা পরিশোধনের পদ্ধতিকে অত্যাধুনিক করে তুলতে পারে।

স্যান্ডারসনের ধারণা, এর মাধ্যমে সৌদি আরব কম খরচে এবং পরিবেশবান্ধবভাবে খনিজ সম্পদ প্রক্রিয়াজাত করে চীনের জায়গা নিতে পারে।

এর পরিবেশগত প্রভাব কতটা হবে, তা এখনো দেখা বাকি। সম্প্রতি জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক অধিবেশনে খনিজ সরবরাহ শৃঙ্খলের স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করা এবং খননকাজের ক্ষেত্রে পরিবেশগত ক্ষতি সীমিত করতে একটি খসড়া প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছিল। সৌদি আরবসহ কয়েকটি খনিজ সম্পদসমৃদ্ধ দেশ ওই প্রস্তাবের বিরোধিতা করেছে।

স্যান্ডারসন বলেন, নিজেদের খনিজ কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজটি সৌদি আরবের জন্য যে একেবারে সহজ হবে, তা নয়। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতার বিষয়টি এ ক্ষেত্রে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে থেকে গেছে। এ ছাড়া সৌদি আরব ও খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ আফ্রিকার দেশগুলোর মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্কও মিশ্র ধরনের।

স্যান্ডারসন মনে করেন, মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে যাদের নিজস্ব খনিজ সম্পদ আছে এবং যাদের সঙ্গে আরামকোর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে, তাদের দ্বারস্থ হতে পারে সৌদি আরব।

ক্রিটিক্যাল মিনারেলস ইনস্টিটিউটের সহসভাপতি আরও বলেন, ‘এটি তাত্ক্ষণিকভাবে লাভবান হওয়ার কোনো খেলা নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়ার একটি কৌশল।’

তথ্যসূত্র: সিএনএন ও প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়