শিরোনাম
◈ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ◈ বিশ্বকা‌পের প্রস্তু‌তি ম‌্যা‌চে ‌রোববার সকা‌লে মিশরের মুখোমুখি ব্রাজিল ◈ অপরাধী শনাক্তে ঢাকায় এআই প্রযুক্তি: ২ লাখ অপরাধীর তথ্য যুক্ত হচ্ছে, মুখমণ্ডল শনাক্ত করে পাঠাবে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা ◈ এবা‌রের বিশ্বকা‌পে আ‌র্জেন্টিনা ক‌তোটা শ‌ক্তিশালী, রোববার সকা‌লে পরীক্ষা নে‌বে হন্ডুরাস ◈ দেশের শিশুস্বাস্থ্যে গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, তবু শয্যা ও প্রযুক্তি সংকট ◈ কাল শুরু হচ্ছে সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন, বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ◈ 'অনেক কষ্টে এসএসসি পাস করেছে' কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসককে নিয়ে আসিফের কড়া মন্তব্য; দিলেন বরাদ্দের ব্যাখ্যা ◈ তুরস্ক কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে? ◈ ট্রাম্পের জন্য ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’: জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত চায় ইরান ◈ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠক

প্রকাশিত : ১১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:১৩ সকাল
আপডেট : ২৯ মে, ২০২৬, ০২:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

‘মুজিব ভাই’ বিতর্ক: ৪২ কোটি যেভাবে ৪ হাজার কোটি টাকা হলো

বাংলা ট্রিবিউন প্রতিবেদন: নির্বাচন আর রাজনৈতিক সকল অস্থিরতা ছাপিয়ে আলোচনার বড় খোরাক যোগালো সিনেমা ‘মুজিব ভাই’। ৯ জানুয়ারি খবরে প্রকাশ হলো, আওয়ামী আমলে ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি সিনেমা বানাতেই নাকি খরচ দেখানো হয়েছে ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকা! যাকে রাষ্ট্রীয় অর্থের অবিশ্বাস্য ‘লুটপাট’ হিসেবে বিবেচনা করছে দেশের বেশিরভাগ মানুষ। তথ্যটি অবিশ্বাস্য বলেও দাবি করছেন অনেকে।

এই ‘লুটপাট’র তথ্যসূত্র হিসেবে গণমাধ্যমগুলো ব্যবহার করেছে সরকার প্রকাশিত একটি ‘শ্বেতপত্র’কে। বাংলাদেশের ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতে গত ১৫ বছরে সংঘটিত দুর্নীতি, অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে ৫ জানুয়ারি বিস্তৃত এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করেছে সরকার। ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ওয়েবসাইটে ৩ হাজার ২৭২ পৃষ্ঠার এই শ্বেতপত্র প্রকাশ করা হয়। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং নাগরিককেন্দ্রিক টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করতে এই দলিল নীতিগত দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

যদিও শ্বেতপত্রটি সেই কাজ করার চেয়ে বিতর্ক আর বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে গণমাধ্যমের সূত্র ধরে। কারণ, এই শ্বেতপত্রের যে বিষয়টি নিয়ে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেটি হলো ‘মুজিব ভাই’ নামের একটি সিনেমার অবিশ্বাস্য নির্মাণ ব্যয়।

এই অবিশ্বাস আর বিস্ময় কাটাতেই অনুসন্ধানে নামে ‘মুজিব ভাই’ প্রসঙ্গে। মজার তথ্য হলো, যে শ্বেতপত্রের সূত্র ধরে গণমাধ্যমগুলো খবর প্রকাশ করেছে ৪ হাজার ২১১ কোটি টাকার তথ্য, সেটির কোনও অস্তিত্ব মেলেনি তাতে! তাতে ৪২১১.২২ লাখ টাকার একটি হিসেব আছে বটে। যদি সেটিকেও ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার নির্মাণ খরচ ধরা হয়, ততেও ৪ হাজার ২ শত ১১ কোটি টাকার হিসাব মিলছে না।

শহরের নানাবিধ অঙ্কবিদদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ৪২১১.২২ লাখ টাকা মানে হচ্ছে ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা প্রায়। সেটি কোনোভাবেই ৪ হাজার কোটি টাকা হতে পারে না। অথচ দেশের অসংখ্য গণমাধ্যম ‘শ্বেতপত্রে’র সূত্র দিয়ে সেই খবরটিই প্রকাশ করছে দু’দিন ধরে।

‘মুজিব ভাই’-এর একটি দৃশ্য এবার চোখ ফেরানো যাক পুরো গল্পে। অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার কর্তৃক অনুসন্ধান করে প্রকাশিত এই দীর্ঘ শ্বেতপত্রে ‘মুজিব ভাই’ কিংবা ৪২১১.২২ লাখ টাকা ব্যয়ের হিসাবকে ঠিক কিভাবে উল্লেখ করেছে?

শ্বেতপত্রের ফ্যাক্ট ১২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, করদাতাদের অর্থ ব্যবহার করে আইসিটি ডিভিশন অনুৎপাদনশীল ও দলীয় কার্যক্রমে অর্থ ব্যয় করেছে—এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্ট আইসিটি ডিভিশনের সঙ্গে একাধিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ দলীয় উদ্দেশ্যসম্পন্ন কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ‘খোকা’ নামের অ্যানিমেটেড সিরিজ এবং ‘মুজিব ভাই’ শীর্ষক অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র নির্মাণ।

এরপর শ্বেতপত্রে বলা হয়, একটি আইনি নথিতে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সঙ্গে সিআরআই-এর সরাসরি সম্পৃক্ততার উল্লেখ পাওয়া গেছে। আইসিটি ডিভিশনের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, আইসিটি ডিভিশনের তহবিল থেকে মোট ৪২১১.২২ লাখ টাকা (৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকা) রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে।

লক্ষ্য করবেন, বলা হয়েছে এই টাকা ‘রাজনৈতিক প্রচারণামূলক কার্যক্রমে ব্যয় করা হয়েছে’। যা কোনোভাবেই ‘মুজিব ভাই’ নির্মাণ ব্যয় নয়।

এরপর একই প্রসঙ্গে শ্বেতপত্রে আরও বলা হয়েছে, বিভিন্ন প্রকল্পের উপাদানে স্পষ্টভাবে দলীয় পক্ষপাতের ছাপ দেখা গেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩) এবং ‘খোকা’, ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩)—এই উদ্যোগগুলো সরাসরি আইসিটি ডিভিশনের অর্থায়নে বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানা গেছে। ‘মুজিব ভাই’ মূলত ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিংয়ের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক ব্র্যান্ডিং প্রকল্প হিসেবে কাজ করেছে, আর ‘খোকা’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মহিমান্বিত করে দলীয় বয়ানকে আরও জোরদার করেছে। একইভাবে, সরকারি অর্থায়নে আয়োজিত ‘শেখ রাসেল দিবস’-এর মতো অনুষ্ঠানগুলোও উন্নয়নমূলক লক্ষ্য নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের মাধ্যম হিসেবে সমালোচিত হয়েছে।

শ্বেতপত্রের তথ্য ও ভাষ্য মতে, এটুকু স্পষ্ট; ৭ মার্চের ভাষণ (২০১৭), ‘মুজিব ভাই’ (২০২৩), ‘খোকা’ এবং ‘সমৃদ্ধ আগামীর প্রতিচ্ছবি’ (২০২৩) নামের অডিও-ভিজ্যুয়াল কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে তৎকালীন আইসিটি মন্ত্রণালয় ও সিআরআই ৪২ কোটি ১১ লাখ ২২ হাজার টাকার মতো ব্যয় করেছে।

ছবিটির ছাড়পত্র এবার ফেরা যাক হঠাৎ আলোচিত হয়ে ওঠা ‘৪ হাজার কোটি’ টাকা ব্যয়ের ‘মুজিব ভাই’ সিনেমা প্রসঙ্গে। এটি কে বানিয়েছেন। কারা সঙ্গে ছিলেন। কবে মুক্তি পেয়েছিলো। দৈর্ঘ্য কতটুকু। দর্শকমনে সেসব জানার আগ্রহটাও তৈরি হয়েছে নিশ্চয়ই।

২০২৩ সালের ২৩ জুন রাজধানীর সীমান্ত সম্ভারের স্টার সিনেপ্লেক্সে ‘মুজিব ভাই’-এর প্রিমিয়ার শো অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে জানানো হয়েছিলো, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ অবলম্বনে ‘মুজিব ভাই’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের মোবাইল গেম ও অ্যাপ্লিকেশনের দক্ষতা উন্নয়ন প্রকল্প। উক্ত প্রিমিয়ার শোতে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহ্‌মেদ পলক, চলচ্চিত্রটির দুই পরিচালক চন্দন কুমার বর্মন ও সোহেল মোহাম্মদ, চিত্রনাট্যকার আদনান আদিব খানসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

সিনেমাটি প্রসঙ্গে জুনাইদ আহমেদ পলক সেদিন (২৩ জুন, ২০২৩) বলেন, ‘দেশের অ্যানিমেশন শিল্পকে, অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে এবং দেশের তরুণদের অ্যানিমেশন শিল্পে উদ্বুদ্ধ করতে এই সিনেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। আগামীকাল (২৪ জুন) থেকে আমরা চলচ্চিত্রটি বিভিন্ন সিনেপ্লেক্সে এবং তারপরে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম এবং বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচার করা হবে, যাতে আমাদের শিশু ও তরুণরা সেই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে আমাদের বঙ্গবন্ধু যেই অত্যন্ত সাহসী নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিলেন ছিলেন তা সম্পর্কে জানতে পারে।’

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটিতে মা-বাবার আদরের খোকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কীভাবে বাংলার মানুষের কাছে ‘মুজিব ভাই’ হয়ে উঠলেন, তা জানানোর পাশাপাশি তাঁর জীবনসংগ্রাম সংক্ষেপে তুলে ধরা হয়েছে। অ্যানিমেশনের মাধ্যমে তৈরি হওয়ায় সব বয়সী দর্শকেরা সহজেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনী সম্পর্কে সহজে জানতে পারবেন বলেও আশা করছিলেন সংশ্লিষ্টরা। চলচ্চিত্রটির অ্যানিমেশন তৈরি করেছে টেকনোম্যাজিক প্রাইভেট লিমিটেড ও হাইপার ট্যাগ লিমিটেড।

এদিকে ‘মুজিব ভাই’ প্রসঙ্গে আরও বিস্তারিত জানবার লক্ষ্যে যোগাযোগ করা হয় চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক সমিতির একাধিক সদস্যের সঙ্গে। কিন্তু তাদের কাছ থেকে এই সিনেমা সম্পর্কে কোনও উল্লেখযোগ্য তথ্য মেলেনি কিংবা এড়িয়ে গেছেন।

তবে এই সিনেমা ও সাম্প্রতিক সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে তরুণ নির্মাতা আনন্দ কুটুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমি যতদূর জানি, সিআরআই-এর উদ্যোগে এই সিনেমাটি বানানো হয়েছিলো। আমি তখন যেটুকু শুনেছি, এটার পেছনে মাত্র ৪ কোটির মতো বাজেট ছিলো। অ্যানিমেটেড সিনেমার জন্য এটা আসলে সে অর্থে বাজেটই না। সেই টাকাটিও বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান স্পন্সর করেছিলো বলে আমি জেনেছিলাম। এই তথ্যগুলো আসলে আমি তখন নিয়েছিলাম একজন নির্মাতা হিসেবে, নিজের আগ্রহ থেকেই। আজ দেখি সেটি ৪ হাজার কোটি টাকার ঘটনায় রূপ নিলো। এটা অবিশ্বাস্য।’

কথিত ৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ‘মুজিব ভাই’ সিনেমার দৈর্ঘ্য মাত্র ৪৫ মিনিট! ছবিটি সেন্সর বোর্ডের ছাড়পত্র পায় একই বছরের ২৬ জুন। এটি ইউটিউবে সার্চ দিয়ে যে কেউ দেখতে পারবেন, রয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মেও।



  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়