শিরোনাম
◈ অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও বৃহৎ শক্তির ভারসাম্যের চ্যালেঞ্জে বাংলাদেশ ◈ বিশ্বকা‌পের প্রস্তু‌তি ম‌্যা‌চে ‌রোববার সকা‌লে মিশরের মুখোমুখি ব্রাজিল ◈ অপরাধী শনাক্তে ঢাকায় এআই প্রযুক্তি: ২ লাখ অপরাধীর তথ্য যুক্ত হচ্ছে, মুখমণ্ডল শনাক্ত করে পাঠাবে তাৎক্ষণিক সতর্কবার্তা ◈ এবা‌রের বিশ্বকা‌পে আ‌র্জেন্টিনা ক‌তোটা শ‌ক্তিশালী, রোববার সকা‌লে পরীক্ষা নে‌বে হন্ডুরাস ◈ দেশের শিশুস্বাস্থ্যে গবেষণার কেন্দ্র বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল, তবু শয্যা ও প্রযুক্তি সংকট ◈ কাল শুরু হচ্ছে সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন, বাজেটের সম্ভাব্য আকার ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা ◈ 'অনেক কষ্টে এসএসসি পাস করেছে' কুমিল্লা জেলা পরিষদ প্রশাসককে নিয়ে আসিফের কড়া মন্তব্য; দিলেন বরাদ্দের ব্যাখ্যা ◈ তুরস্ক কেন বাংলাদেশের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা বাড়াতে চাইছে? ◈ ট্রাম্পের জন্য ‘বিশ্বাসের পরীক্ষা’: জব্দকৃত ২৪ বিলিয়ন ডলার ফেরত চায় ইরান ◈ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদারে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে হাকান ফিদানের বৈঠক

প্রকাশিত : ১৭ মে, ২০২৬, ০৮:২৬ রাত
আপডেট : ০৪ জুন, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সুন্দরবনে কোস্ট গার্ডের অভিযানে করিম শরীফ বাহিনীর দুই দস্যু আটক অস্ত্র-গুলিসহ উদ্ধার ৪ অপহৃত জেলে

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে অভিযান চালিয়ে ডাকাত করিম শরীফ বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ দুই দস্যুকে আটক করেছে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা। এসময় তাদের কাছ থেকে ৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৪ রাউন্ড তাজা কার্তুজ উদ্ধার করা হয়। একইসঙ্গে মুক্তিপণের দাবিতে অপহৃত ৪ জেলেকেও উদ্ধার করেছে কোস্ট গার্ড।

রোববার (১৭ মে) দুপুরে কোস্ট গার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

কোস্ট গার্ড সূত্র জানায়, সুন্দরবন অঞ্চলে সক্রিয় বন ও জলদস্যু বাহিনী নির্মূলের লক্ষ্যে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের নেতৃত্বে “অপারেশন রিস্টোর পিস ইন সুন্দরবন” এবং “অপারেশন ম্যানগ্রোভ শিল্ড” নামে বিশেষ অভিযান চলমান রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় করিম শরীফ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়।

প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রোববার ভোরে কোস্ট গার্ডের কাছে গোয়েন্দা তথ্য আসে যে, পূর্ব সুন্দরবনের ঢাংমারী খাল সংলগ্ন এলাকায় করিম শরীফ বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছে। পরে ভোর ৪টার দিকে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের একটি বিশেষ দল সেখানে অভিযান চালায়।

অভিযানের সময় কোস্ট গার্ড সদস্যদের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকাত দলটি বনের গভীরে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এসময় ধাওয়া দিয়ে ডাকাত মোঃ রবিউল শেখ (৩০) ও রাজন শরীফ (২০) কে আটক করা হয়।

আটককৃতদের কাছ থেকে ১টি বিদেশি একনলা বন্দুক, ২টি দেশীয় একনলা বন্দুক এবং ২৪ রাউন্ড তাজা কার্তুজ জব্দ করা হয়েছে। পরে ওই এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে মুক্তিপণের দাবিতে জিম্মি করে রাখা ৪ জেলেকে উদ্ধার করা হয়।

কোস্ট গার্ড জানায়, আটক রবিউল শেখ ও রাজন শরীফ বাগেরহাট জেলার রামপাল ও মোরেলগঞ্জ উপজেলার বাসিন্দা। রাজন শরীফ দীর্ঘদিন ধরে করিম শরীফ বাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে সুন্দরবনে ডাকাতি, জেলে অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়সহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়া আটক রাজন শরীফের বিরুদ্ধে বাগেরহাট সদর থানায় একটি হত্যা মামলাসহ ডাকাতি, জেলে অপহরণ ও মুক্তিপণের একাধিক অভিযোগ রয়েছে বলেও জানিয়েছে কোস্ট গার্ড।

কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের নির্বাহী কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট আশিকুল ইসলাম ইমন জানান, জব্দকৃত অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আটক দস্যুদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। একইসঙ্গে উদ্ধার হওয়া জেলেদের তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তরের কার্যক্রমও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “সুন্দরবনে বন ও জলদস্যুদের সম্পূর্ণ নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত কোস্ট গার্ডের অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

সুন্দরবনের নদী ও বনাঞ্চল ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় বিভিন্ন বনদস্যু বাহিনীর কারণে জেলে, বাওয়ালি ও মৌয়ালদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জীবিকার তাগিদে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করা সাধারণ মানুষ প্রায়ই অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের শিকার হচ্ছেন। কোস্ট গার্ডের চলমান এসব অভিযানকে স্বস্তির বার্তা হিসেবে দেখছেন উপকূলীয় জনপদের মানুষ।বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত অপার সবুজের এক বিস্ময়কর রাজ্য—সুন্দরবন। নদী, খাল, কাদা, জোয়ার-ভাটা, গরান-গেওয়া-সুন্দরী গাছ আর বন্যপ্রাণীর এক অপরূপ সহাবস্থানের নাম এই বন। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের গর্ব নয়, এটি বিশ্ববাসীরও এক অমূল্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য।

বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষা এ বনাঞ্চল প্রকৃতির এক বিস্ময়কর সৃষ্টি। এখানে প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার ছন্দে বদলে যায় নদীর রূপ, জেগে ওঠে নতুন চর, আবার বিলীন হয় কাদামাটির পথ। বনের ভেতরে প্রবেশ করলেই মনে হয় যেন প্রকৃতির এক জীবন্ত জাদুঘরে এসে দাঁড়ানো হয়েছে। চারদিকে নীরবতা, মাঝে মাঝে পাখির ডাক, দূরে হরিণের ছুটে চলা কিংবা নদীর কিনারে কুমিরের অলস ভেসে থাকা—সব মিলিয়ে এক রহস্যময় পরিবেশ।

বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬ হাজার ১৭ বর্গকিলোমিটার। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এ বন বিস্তৃত। বনটি অসংখ্য নদী ও খাল দ্বারা বিভক্ত। পশুর, শিবসা, রূপসা, বলেশ্বর, রায়মঙ্গলসহ বহু নদী সুন্দরবনের প্রাণপ্রবাহকে সচল রেখেছে।

সুন্দরবনের নামকরণ নিয়েও রয়েছে নানা মত। অনেকে মনে করেন, সুন্দরী গাছের আধিক্য থেকেই ‘সুন্দরবন’ নামের উৎপত্তি। আবার কেউ কেউ বলেন, এ বনের সৌন্দর্যের কারণেই এর নাম হয়েছে সুন্দরবন। ইতিহাসবিদদের মতে, বহু শতাব্দী ধরে এ বন উপকূলীয় জনপদকে রক্ষা করে আসছে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াল আঘাত থেকে।

বিশ্বের অন্যতম সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের আধার এই বন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারের নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে সুন্দরবনের রয়েছে আন্তর্জাতিক পরিচিতি। এছাড়াও চিত্রা হরিণ, বানর, বন্য শূকর, মেছোবাঘ, কুমির, ডলফিন, অজগরসহ অসংখ্য প্রাণীর বিচরণ এখানে। শীত মৌসুমে বিভিন্ন দেশ থেকে আগত অতিথি পাখিদের কোলাহলে মুখর হয়ে ওঠে বনাঞ্চল।

বনের ভেতরে চলাচল করতে গেলে প্রকৃতির শক্তি ও রহস্য দুটোই অনুভব করা যায়। সরু খাল দিয়ে ট্রলার এগিয়ে গেলে দুই পাশের গাছের ডাল মাথার ওপর ছায়া তৈরি করে। মাঝেমধ্যে কাদার ওপর হরিণের পায়ের ছাপ কিংবা বাঘের পদচিহ্ন দেখে আতঙ্ক আর বিস্ময় একসঙ্গে কাজ করে। বনজীবীদের কাছে প্রতিটি দিনই সংগ্রামের, প্রতিটি মুহূর্ত অনিশ্চয়তার।

মৌয়াল, বাওয়ালি ও জেলেদের জীবন সুন্দরবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জীবিকার তাগিদে তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বনে প্রবেশ করেন। মধু সংগ্রহ, মাছ ধরা, গোলপাতা কাটা কিংবা কাঠ আহরণ—সবকিছুর মধ্যেই লুকিয়ে থাকে বাঘের আক্রমণ, দস্যুতা কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়। তারপরও জীবিকার জন্য তাদের বনের ওপর নির্ভর করতেই হয়।

সুন্দরবন শুধু জীববৈচিত্র্যের আধার নয়, এটি উপকূলীয় মানুষের জীবনরক্ষাকারী প্রাকৃতিক ঢাল। ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা, আম্পান কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন দুর্যোগে সুন্দরবন বুক পেতে না দাঁড়ালে দক্ষিণাঞ্চলের ক্ষয়ক্ষতি আরও ভয়াবহ হতো বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

তবে জলবায়ু পরিবর্তন, নদীভাঙন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, বন উজাড়, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, অবৈধ শিকার এবং শিল্প দূষণের কারণে সুন্দরবন আজ নানা হুমকির মুখে। সুন্দরী গাছের আগাম মৃত্যু, নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া এবং প্রাণীদের আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় পরিবেশবিদদের উদ্বেগ বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন রক্ষায় শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বন রক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিকল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও জরুরি।

পর্যটকদের কাছেও সুন্দরবন এক আকর্ষণীয় গন্তব্য। করমজল, হারবাড়িয়া, কটকা, কচিখালী, হিরণ পয়েন্ট কিংবা দুবলার চর—প্রতিটি স্থানেই রয়েছে প্রকৃতির ভিন্ন স্বাদ। সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় নদীর জলে লাল আভা ছড়িয়ে পড়ার দৃশ্য যেন এক অপার্থিব অনুভূতি তৈরি করে।

বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পাওয়া এ বন শুধু একটি বনভূমি নয়; এটি বাংলাদেশের পরিবেশ, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও উপকূলীয় মানুষের অস্তিত্বের প্রতীক। সুন্দরবন বেঁচে থাকলে বেঁচে থাকবে উপকূল, বেঁচে থাকবে প্রকৃতি ও প্রাণ।

তাই বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন রক্ষায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। কারণ সুন্দরবন ধ্বংস হলে শুধু একটি বন হারাবে না, হারিয়ে যাবে এক বিশাল প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, বিপন্ন হবে লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়