শিরোনাম
◈ প্রথম সফরে মালয়েশিয়া কেন বেছে নিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান? : ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন ◈ শত্রু দেশ যুক্তরা‌স্ট্রে খেলা ইরা‌নের, দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটা‌তে মনপ্রাণ উজাড় ক‌রে খেল‌বেন ইরানি ফুটবলাররা ◈ বিদেশি ফ্রাঞ্চাইজি লি‌গে খেলার জন‌্য অবসর নেয়া বন্ধ কর‌তে কড়া নিয়ম আনার পথে বিসিসিআই ◈ গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ১০০ দিন: স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির নতুন সমীকরণ ◈ ভূমি কর্মকর্তাদের ২৫ জুনের মধ্যে সম্পদের হিসাব দেওয়ার নির্দেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের ◈ দ. এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য বাংলাদেশ ‘কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ’ দেশ: তুরস্ক ◈ ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস, সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় ◈ স্বর্ণের দামে বড় পতন বিশ্ববাজারে ◈ ডিপফেক-মিথ্যা তথ্য রোধে এআই নীতিমালা আনছে সরকার ◈ গুলশানে দুটি স্পা সেন্টারে পুলিশের অভিযান, ২৮ জন আটক

প্রকাশিত : ১৬ মে, ২০২৬, ০৮:৪০ রাত
আপডেট : ০৩ জুন, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুখোমুখি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত

চট্টগ্রাম বন্দরের চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার ব্যবসা পেতে এবার সরাসরি প্রতিযোগিতায় নেমেছে মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিশালী দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরব। একই টার্মিনাল দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালনার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড এবং সৌদি আরবের রেড সি গেটওয়ে টার্মিনালস (আরএসজিটি)। এ প্রতিযোগিতায় যুক্ত হয়েছে দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও।

গত ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ–দুবাই প্ল্যাটফর্ম সভায় সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয় দুবাই সরকারের মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড। এর দুই সপ্তাহ পর ২২ এপ্রিল সৌদি আরবের সরকারি–বেসরকারি যৌথ মালিকানাধীন আরএসজিটি একই টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দিয়েছে।

এত দিন পর্যন্ত দুই দেশ চট্টগ্রাম বন্দরের পৃথক দুটি টার্মিনাল ঘিরে আগ্রহ দেখালেও এবারই প্রথম একই টার্মিনালকে কেন্দ্র করে তাদের প্রতিযোগিতা প্রকাশ্য রূপ নিল। এর মধ্যে ২০২৪ সালে সৌদি আরবের আরএসজিটি পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল ২২ বছরের জন্য পরিচালনার দায়িত্ব পায়। অন্যদিকে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া এখনো চলমান।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে সৌদি–আমিরাত দ্বন্দ্ব এখন প্রকাশ্যে। দেশ দুটি প্রায় সব ক্ষেত্রেই একে অপরের মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। ১ মে সৌদি নেতৃত্বাধীন তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জোট ওপেক থেকে বেরিয়ে গেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। বাংলাদেশে বন্দর টার্মিনালের ব্যবসা পেতে দুই দেশের প্রতিযোগিতা এ দ্বন্দ্বের ধারাবাহিকতা কি না, তা জানা যায়নি।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ প্রতিযোগিতা শুধু বন্দর ব্যবসার নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অংশও। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সৌদি আরব ও আমিরাত প্রায় সব কৌশলগত খাতেই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক অবস্থানে রয়েছে।

চালু টার্মিনালেই বেশি আগ্রহ

চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনাল পরিচালনা করছে আরএসজিটি। বাকি তিনটি জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি), সিসিটি ও এনসিটি এখনো দেশীয় অপারেটরদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।

বন্দরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, নতুন টার্মিনাল নির্মাণে শতকোটি ডলার বিনিয়োগ ও দীর্ঘ নির্মাণঝুঁকি থাকে। কিন্তু চালু টার্মিনাল হাতে পেলেই তাৎক্ষণিক নগদপ্রবাহ নিশ্চিত হয়। ফলে দেশি–বিদেশি অপারেটরদের মূল আগ্রহ এখন চালু টার্মিনালগুলোকে ঘিরেই।

সিসিটি ঘিরে সৌদি–আমিরাতের কৌশল

ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী, এনসিটি ও সিসিটিকে একীভূত করে একটি বড় টার্মিনাল হিসেবে পরিচালনা করতে চায় তারা। দুটি টার্মিনাল পাশাপাশি হওয়ায় এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নযোগ্য বলেই তারা মনে করছে। অন্যদিকে সৌদি আরএসজিটি চায় সিসিটি ও জিসিবিকে একীভূত করে দীর্ঘ মেয়াদে পরিচালনা করতে। এতে প্রাথমিকভাবে ৬০ কোটি ডলার বা প্রায় ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বিনিয়োগের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিনিয়োগের পর বছরে ১৮ লাখ একক কনটেইনার এবং ৫০ লাখ টন পণ্য ওঠানো–নামানোর সক্ষমতা তৈরি হবে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

সিসিটির ভৌগোলিক অবস্থানও এ প্রতিযোগিতার বড় কারণ। এটি এনসিটি ও জিসিবির মাঝামাঝি হওয়ায় যে পক্ষ এটি পাবে, তারা কার্যত বন্দরের বেশির ভাগ কনটেইনার পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ পাবে।

বন্দর সূত্র অনুযায়ী, গত বছর চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনারের ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং প্রায় ৪ শতাংশ পতেঙ্গা টার্মিনালে ওঠানো–নামানো হয়েছে। সে হিসাবে এনসিটি–সিসিটি একীভূত হলে ডিপি ওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণে যাবে প্রায় ৬০ শতাংশ কনটেইনার। আর সিসিটি–জিসিবি একীভূত হলে আরএসজিটির নিয়ন্ত্রণে যাবে প্রায় ৫৫ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতিযোগিতা মূলত বন্দরের প্রধান ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ নিয়েই।

দেশীয় এমজিএইচের পাল্টা প্রস্তাব

বিদেশি দুই প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি দেশীয় বহুজাতিক এমজিএইচ গ্রুপও প্রতিযোগিতায় সক্রিয় রয়েছে। গত বছর মার্চে তারা সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছিল। পরে ২৮ এপ্রিল নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনার জন্য নতুন করে প্রস্তাব জমা দেয়।

ডিপি ওয়ার্ল্ড যেখানে প্রতি কনটেইনারে ১৫৫ থেকে ১৬১ দশমিক ৮ ডলার রাজস্ব আয়ের বিপরীতে বন্দরকে যথাক্রমে ৯৩ ডলার ৫০ সেন্ট ও ৯৭ ডলার ৫০ সেন্ট দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল, সেখানে এমজিএইচ একই স্তরে ৯৮ দশমিক ৫০ ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তাদের দাবি, এ মডেলে ১৫ বছরে বন্দর প্রায় ১৬৮ কোটি ডলার বা ২০ হাজার ৬৬৪ কোটি টাকা আয় করতে পারবে।

এমজিএইচ গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এনসিটি পরিচালনায় অন্য যেকোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বন্দরকে বেশি রাজস্ব দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি আমরা।’ দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ার কারণে দেশের টাকা দেশেই থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সরকারের সিদ্ধান্ত কী

বর্তমানে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনা নিয়ে মূল্যায়ন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তবে সিসিটি ও জিসিবি কোন মডেলে পরিচালিত হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনালগুলোয় বিনিয়োগ ও পরিচালনার অনেকগুলো প্রস্তাব এসেছে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যেসব প্রস্তাব আমরা পেয়েছি, সেগুলো পর্যালোচনা করে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

বাংলাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যের কেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দর এখন শুধু পণ্য ওঠানো–নামানোর জায়গা নয়; এটি মধ্যপ্রাচ্যের দুই আঞ্চলিক শক্তি ও দেশীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর নতুন কৌশলগত প্রতিযোগিতার মঞ্চেও পরিণত হয়েছে। সরকার শেষ পর্যন্ত কাকে বেছে নেয়, তার ওপর নির্ভর করবে বন্দরের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক মানচিত্র। যদিও চালু টার্মিনাল ঘিরে বাড়তি আগ্রহের ফলে নতুন প্রকল্পগুলো বিনিয়োগসংকটে পড়তে পারে বলে অনেকের শঙ্কা আছে।

বন্দর পর্ষদের সাবেক সদস্য মো. জাফর আলম প্রথম আলোকে বলেন, চালু টার্মিনালে আগ্রহ বেশি, কারণ এখানে বড় নির্মাণঝুঁকি নেই। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বন্দরের আধুনিকায়ন করতে হলে বে টার্মিনালের মতো নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগ টানতে হবে। পুরোনো টার্মিনালেই যদি সবাই মনোযোগ দেয়, তাহলে নতুন প্রকল্পে বিনিয়োগে ভাটা পড়তে পারে।

সূত্র: প্রথম আলো

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়