শিরোনাম
◈ গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের ১০০ দিন: স্থিতিশীলতা, সংস্কার ও প্রবৃদ্ধির নতুন সমীকরণ ◈ ভূমি কর্মকর্তাদের ২৫ জুনের মধ্যে সম্পদের হিসাব দেওয়ার নির্দেশ ভূমি মন্ত্রণালয়ের ◈ দ. এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও শান্তির জন্য বাংলাদেশ ‘কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ’ দেশ: তুরস্ক ◈ ইউরোপের মাটিতে ইতিহাস, সান মারিনোর বিপক্ষে বাংলাদেশের জয় ◈ স্বর্ণের দামে বড় পতন বিশ্ববাজারে ◈ ডিপফেক-মিথ্যা তথ্য রোধে এআই নীতিমালা আনছে সরকার ◈ গুলশানে দুটি স্পা সেন্টারে পুলিশের অভিযান, ২৮ জন আটক ◈ হাদি হত্যা মামলায় জাবেরকে বাদী করার কারণ জানতে চান বোন মাসুমা ◈ বাজেট অধিবেশন ঘিরে সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহন ও মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ◈ এশিয়ান গেমস ক্রিকে‌টে বাংলা‌দেশসহ ১০ দল চূড়ান্ত, অ‌ক্টোব‌রে খেলা হ‌বে জাপা‌নে 

প্রকাশিত : ০৩ জুন, ২০২৬, ০৮:০৫ রাত
আপডেট : ০৬ জুন, ২০২৬, ০১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিদেশি যন্ত্রাংশের আড়ালে দেশীয় পণ্য রেলে

এম আর আমিন, চট্টগ্রাম : বাংলাদেশ রেলওয়েতে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের কারণে নিরাপদ এই পরিবহন খাতটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশেষ করে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের নামে নিম্নমানের দেশীয় কিংবা নকল খুচরা যন্ত্রাংশ সরবরাহের অভিযোগ দিন দিন উদ্বেগজনক আকার ধারণ করছে। এতে একদিকে সরকারের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে, অন্যদিকে সেবার মান ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডারে বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশ সরবরাহের শর্ত থাকলেও বাস্তবে ১০ থেকে ২০ শতাংশ আসল যন্ত্রাংশ দেখিয়ে বাকি ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ নিম্নমানের বা নকল মালামাল সরবরাহ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব যন্ত্রাংশের প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় ১০ থেকে ১২ গুণ বেশি দাম আদায় করা হচ্ছে। কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার এ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় ক্ষতির মুখে পড়ছে রাষ্ট্র।

পাহাড়তলী সিসিএস দপ্তরে বিদেশি মালামাল সরবরাহের জন্য ৩৪টি প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, একটি অসাধু চক্র কমিশনের বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ করে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে এসব অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ফলে প্রকৃত মানসম্পন্ন যন্ত্রাংশের পরিবর্তে কম দামের পণ্য সরবরাহ করে অতিরিক্ত বিল আদায়ের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। নকল বা নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে যন্ত্রপাতি দ্রুত বিকল হয়ে পড়ে, দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও বৃদ্ধি পায়। এতে স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি জনগণের ভোগান্তিও বাড়ছে।

রেলওয়ের ইঞ্জিন, বগি, ব্রেকিং সিস্টেম, সিগন্যালিং, বিয়ারিং, কাপলিং এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশের মান নিয়ে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই। কারণ একটি ছোট যান্ত্রিক ত্রুটিও বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। কিন্তু নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের ফলে সেগুলো দ্রুত বিকল হয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বেড়ে যায়।

সংশ্লিষ্ট খাতের কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিদেশি অরিজিনাল যন্ত্রাংশের নামে নকল পণ্য সরবরাহের বিষয়টি নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে একটি সিন্ডিকেট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রভাব খাটিয়ে এ ধরনের অনিয়ম করে আসছে। অভিযোগ থাকলেও অনেক সময় কার্যকর তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ায় অনিয়মকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রেল খাতে এ ধরনের দুর্নীতি শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি সরাসরি জননিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। উন্নত বিশ্বে রেল খাতে ব্যবহৃত প্রতিটি যন্ত্রাংশের মান কঠোরভাবে যাচাই করা হয়। অথচ বাংলাদেশে অনেক ক্ষেত্রে কাগজে-কলমে বিদেশি ব্র্যান্ড দেখিয়ে বাস্তবে নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুরোনো এলসির কাগজপত্র ও জাল সনদও ব্যবহার করা হয়।

রেলে কর্মরত কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মালামাল গ্রহণের দায়িত্ব ডিসিওএস (DCOS) বা ইন্সপেকশন বিভাগের হলেও ক্রয় প্রক্রিয়ায় পোর্ট ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক করা হয় না। বরং ইউজার বা ভোক্তা পরীক্ষার ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। ফলে কিছু অসাধু কর্মকর্তা মোটা অঙ্কের কমিশনের বিনিময়ে নকল ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশকে আসল হিসেবে প্রত্যয়ন করে থাকেন।

তাদের দাবি, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ব্যবহারের কারণে অনেক ইঞ্জিন ও কোচ নির্ধারিত সময়ের আগেই বিকল হয়ে পড়ে। এতে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যায়। অথচ অরিজিনাল যন্ত্রাংশ ব্যবহার করা হলে দীর্ঘ সময় সেগুলো কার্যকর থাকত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও অনেকাংশে কমে যেত।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ঠিকাদার জানান, যন্ত্রাংশ কেনাকাটা থেকে শুরু করে গ্রহণ পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি ধাপে ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ না দিলে ভালো মানের যন্ত্রাংশকেও বিভিন্ন অজুহাতে খারাপ প্রমাণ করে হয়রানি করা হয়। অন্যদিকে ঘুষ দিলে নিম্নমানের মালামালও সহজেই গ্রহণ করা হয়। ফলে অনেকেই বাধ্য হয়ে ঘুষের মাধ্যমে নকল যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেন।

পোর্ট ইন্সপেকশন না হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে ইন্সপেকশনের দায়িত্বে থাকা জেলা সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (ডিসিওএস-জি) এম এ মুহিত বলেন, “যন্ত্রাংশ গ্রহণের পর মান যাচাইয়ের জন্য তা সংশ্লিষ্ট ইউজারের কাছে পাঠানো হয়। ইউজার সন্তুষ্ট হলে আমরা পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করি। এক্ষেত্রে নিম্নমানের যন্ত্রাংশকে ভালো মানের স্বীকৃতি দেওয়া হলে তার দায় সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পাহাড়তলী ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন মেরামত কারখানার ম্যানেজার রাজিব দেবনাথ বলেন, “স্যাম্পল যন্ত্রাংশগুলো মেশিনের মাধ্যমে পরীক্ষা করা হয়। তবে আমার কারখানায় ব্যবহৃত অধিকাংশ যন্ত্রাংশই দেশীয়, বিদেশি যন্ত্রাংশ খুবই কম।

এ বিষয়ে জাতীয়তাবাদী রেলওয়ে শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম আর মনজু বলেন, “রেলে বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে স্থানীয় ও নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে শুনে আসছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়